আওয়ামীলীগ মুক্তিযুদ্ধকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করছে

আওয়ামীলীগ মুক্তিযুদ্ধকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করছে

“আওয়ামীলীগ মুক্তিযুদ্ধকে পন্য হিসেবে ব্যবহার করছে। বর্তমান ক্ষমতাসীনদের তৈরি মুক্তিযুদ্ধার তালিকা অবৈধ। মুক্তিযুদ্ধের সময় রণাঙ্গনের এক লাখ মুক্তিযুদ্ধাকে আজ তিন লাখে রূপান্তরিত করেছে সরকার” কথাগুলো বলেছেন, বীরমুক্তিযোদ্ধা, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীরবিক্রম)।

গত ১৮.১১.১৪ রোজ মঙ্গলবার বিকেরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি তার এ বক্তব্য তুলে ধরেন। সাংবাদিক সমাবেশে হাফিজ উদ্দিন আরো বলেন, “এ অবৈধ সরকারের আমলে ১৫০জন কর্মকর্তা এবং ১৬জন সচিব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিয়ে সরকার থেকে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করেছে।” তার এ বক্তব্যের কমপক্ষে ২৪ ঘন্টা পর আমি কলম ধরেছি। এ সময়ের মধ্যে আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিনের বক্তব্যের কোন প্রতিবাদ করা হয়েছে বলে আমার চোখে পড়েনি। তাহলে ধরে নিতে হবে হাফিজ সাহেবের এ বক্তব্য পুরোপুরি সত্য এবং এ ব্যাপারে আওয়ামীলীগেরও কোন ভিন্নমত নেই।

অর্থাৎ আওয়ামীলীগ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিক স্বার্থে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করছে। ইতিমধ্যে আওয়ামীলীগের ব্যাপারে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ব্যবহার করে তাদের দলীয় লোক, দলীয়ভাবে নিয়োগ পাওয়ায় সরকারী কর্মকর্তাদের দ্বারা সংঘঠিত নানাবিধ দূর্নীতির ঘটনা মিডিয়ার মাধ্যমে গোটা জাতিসহ বিশ্ববাসী অবহিত হয়েছেন। ভুয়া সার্টিফিকেটের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা হওয়া ছাড়া ও মহান মুক্তিযুদ্ধে বিদেশী বন্ধুদের সম্মাননা প্রদানে তাদের জন্য তৈরি করা ক্রেস্ট স্বর্ণের তৈরি না হওয়ার পরও স্বর্ণের তৈরি বলে চালিয়ে দেওয়ার ঘটনা সকলের মুখে মুখে। স্বর্ণের জায়গায় অন্য কিছু দেয়া হয়েছে। জাতি হিসেবে এর চেয়ে বিশ্বের দরবারে আমরা কোথায় গিয়ে ঠেকেছি?

এমনিতেই মহান মুক্তিযুদ্ধ আওয়ামীলীগ ও তার তৎকালীন নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে নতুন নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। যার ফলে মুক্তিযুদ্ধ আওয়ামীলীগের অবদান নিয়ে এতদিন যা জাতি জানত বা বিভিন্ন পুস্তকে যা লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ? তারপরও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আওয়ামীলীগের মিথ্যাচার, নিজেরা যা করেনি তার চেয়ে বেশি করেছে বরে অপপ্রচার, অপরদিকে মুক্তিযুদ্ধে অন্যদের ভূমিকাকে খাটো করা, তাদের ভূমিকাকে কোন কোন ক্ষেত্রে অস্ত্র কারবারী কিংবা বিস্তৃতরূপে প্রচার করা ইত্যাদি বাড়াবাড়ির ফলে যারা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে কিংবা বিতর্ককে এড়িয়ে চলার দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু সত্য ঘটনা বা ইতিহাস এতদিন চেপে রেখেছিলেন তারাও আওয়ামী বাড়াবাড়িতে বাধ্য হয়ে কিংবা সত্যকে প্রকাশ করার বিবেকের তাগিদে যেসব অজানা তথ্য ও ইতিহাস জাতির সামনে উন্মোচন করতে শুরু করেছেন। ফলে আওয়ামীলীগের থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ার আশঙ্কায় এবং মহান মুক্তিযুদ্ধকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যেতে না পারার আশঙ্কায় বেসামাল হয়ে পড়েছে। ফলে মহান মুক্তিযুদ্ধে যাদের ভূমিকা প্রশ্নের উর্ধ্বে এবং যাদের বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্বের ভূমিকা ও অবদানের ফলে আমরা স্বাধীন দেশ লাভ করেছি তাদেরকে বলা হচ্ছে দেশদ্রোহী, পাকিস্তানের অনুচর, নব্য রাজাকার ইত্যাদি। এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী মরহুম তাজউদ্দিনের যোগ্য উত্তরসূরী তার কন্যা শারমিনের সেদিন নিউইয়র্কে প্রদত্ত বক্তব্য উল্লেখযোগ্য।

তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে এখন সত্য বলাটা অত্যন্ত কঠিন কাজ। কারণ সত্য বললেই সত্য বলার অপরাধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে রাজাকার, স্বাধীনতা বিরোধী বরে গারি দেয়া হয়। ধন্যবাদ শারমিনকে তার সাহসী ইচ্ছা রসের জন্য। বাংলাদেশে বহু লেখক, কলামিস্ট, টকশো আলোচক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজের ব্যক্তি আছেন যারা জ্ঞানী, গবেষক, ইতিহাস সচেতন। তাদের সাথে যোগাযোগ করলে বুঝা যায় তার সত্য ইতিহাস সম্পর্কে অবগত। কিন্তু শুধুমাত্র রাজাকার বা স্বাধীনতা বিরোধী তকমা কপালে জুটবে শুধু এ কারণেই তারা সত্য কথা বলা থেকে বিরত থাকেন কিংবা সত্যকে ঘুরিয়ে বলে নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে প্রমাণ দেন। আর এ সুযোগটি গ্রহণ করে আওয়ামীলীগ আজও ফায়দা লুটে নিচ্ছে। সর্বনাশ হচ্ছে দেশ ও জাতির। আমার ব্যক্তিগত অভিমত হল যেসব সম্মানিত বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিবর্গ আওয়ামী আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য কিংবা জামায়াতের গন্ধ গায়ে লাগবে, কিংবা জামায়াত যেমন ভাবে আপনার কথার দ্বারা যেন ফায়দা পেতে না পারে সে আশঙ্কায় সত্য বলা থেকে বিরত থাকেন বা আছেন। তার মস্ত বড় ভুলের মধ্যে আছেন। কারণ কারো ভয় কিংবা কারো গন্ধ গায়ে লাগবে কিংবা কেউ ফায়দা পেয়ে যাবে এ আশঙ্কায় সত্য গোপন করা অনেক বড় জুলুম। এজুলুম আপনার নিজের উপর। এজুলুম আপনার সন্তানের উপর, এজুলুম আল্লাহ আপনাকে যে জাতির জন্য সৃষ্টি করেছেন সেই গোটা জাতির উপর। বিভিন্ন পেশার ঐ সব সম্মানিত ব্যক্তিকে মনে রাখতে হবে যিনি আপনাদের আমাদের তথা গোটা সৃষ্টি লোককে সৃষ্টি করেছেন তিনি আপনাকে আমাকে মেধা, সাহস ও নিয়ামত দিয়েছেন। তিনিই সত্য উপলব্দির তৌফিক দিয়েছেন। আর তিনি এই সত্য উপলব্দির ক্ষমতা ও মেধা দিয়েছেন এটা গোপন করার জন্য নয় বরং এটা দিয়ে মানবতার কল্যাণ সাধন করার জন্য। তিনি পবিত্র কোরআনে বলেছেন- “তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের কল্যাণ করার জন্য।”

আমরা যদি তাঁর দেয়া এই মেধা ও সত্য উপলব্দির ক্ষমতাকে কঠিন পথে কাজে না লাগাই তাহলে নেয়ামতের এ না শুকরিয়ার জন্য তিনি তাঁর প্রদত্ত এই নেয়ামত ও ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারেন এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে আমাদের জন্য যে মান-সম্মান নির্ধারণ করেছেন তাও অপসারিত হতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন- “তার চাইতে বড় জালেম কে হতে পারে, যার কাছে সত্য রয়েছে, আর যে তা গোপন করে?

সুতরাং আজকে সময় এসেছে সাহসিকতার সাথে সত্য উচ্চারণের। এ সত্য বলতে গিয়ে রাজাকার, স্বাধীনতা বিরোধী, জামায়াতী, দেশদ্রোহী, মানবতাবিরোধী যাই বলা হোক না কেন, এ সত্য বলার মধ্যেই আপনার, আমার, আপনার-আমার ভবিষ্যত প্রজন্মের সর্বোপরি দেশ ও জাতির এবং মৃত্যুর পর আখেরাতে সান্নিধ্য ও তাঁর জান্নাত লাভে ধন্য হওয়ার সুযোগ রয়েছে। যদিও সত্য উচ্চারণ করতে গিয়ে ইতোমধ্যে মহান মুক্তিযুদ্ধের উপাধিনায়ক দেশদ্রোহী আখ্যা পেতে হয়েছে। কি অপরাধে তিনি এ পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেন? তিনি তার এক বই মুক্তিযুদ্ধের ভেতর ও বাহিরে বইতে লিখেছেন- “১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ পর্যন্ত তৎকালীন আওয়ামী নেতৃত্বের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য কোন প্রস্তুতি ছিল না।” ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোন যুদ্ধ বা রাজনৈতিক ইতিহাস লিখতে গিয়ে এর পর্যালোচনা মূলক লিখনীর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যিনি মুক্তিযুদ্ধের উপাধিনায়ক ছিলেন তাকে দেশদ্রোহী বলে প্রচার ও তার শাস্তি দাবী করা তাদেরই পক্ষে সম্ভব যারা মুক্তিযুদ্ধে প্রকৃত অর্থে ভূমিকা রাখার পরিবর্তে এটাকে দলীয়করণ ও এর চেতনাকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার, যাকে ক্ষমতায় যাওয়ার ও ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত রাখতে চায়। ২৬শে মার্চ কালুরঘাটে বেতার কেন্দ্র থেকে স্বহস্তে লিখিত স্বাধীনতার ঘোষক ও সেক্টর অধিনায়ক মেজর মরহুম জিয়াউর রহমানকে পাকিস্তানের চর হিসেবে ভূমিকা পালনকারী হিসেবে যারা বলার সাহস করে তারা মুক্তিযুদ্ধকে পণ্য হিসেবে গণ্য করে। মেজর (অব.) হাফিজ সাহেবের বক্তব্যই জোরালো করে।

তারা মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলকে শুধুমাত্র দেশের সম্পদ ও স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামের অপরাধে প্রথম কারাবন্দি শুধু করেনি বরং তাকেও রাজাকার আখ্যা দিতে কুন্ঠাবোধ করেনি। তারাই বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীকে নব্য রাজাকার বলতে দ্বিধা করেনি। তারা ড.কামাল যিনি বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা, সাংবাদিক এবিএম মূসা, যারা ছিলেন মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম ঘনিষ্ঠজন। তাদেরকে দালাল ও তাদের ব্যাপারে বিরুপ মন্তব্য ও কুটুক্তি করতে তাদের গায়ে লাগেনা। তারাই যদি ভাষা সৈনিক প্রফেসর গোলাম আযম, আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সহ দেশপ্রেমিক জাতীয় ও ইসলামী নেতৃত্বকে রাজাকার, স্বাধীনতা বিরোধী, মানবতাবিরোধী ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে তাদেরকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে নানামুখী চক্রান্ত ও অপচেষ্টা চালায় তাতে বিস্ময় ও অবাক হওয়ার কিছুই নেই। কারণ যারা ছিলেন মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠজন এবং যারা মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানও রেখেছেন তারা যখন সত্য বলার অপরাধে দেশদ্রোহী, নব্য রাজাকার, স্বাধীনতা বিরোধী, দালাল, পাকিস্তানের অনুচর উপাধি লাভ করেন তখন মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন পরিবেশ ও প্রেক্ষপটে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি বরং অনেকটা বাধ্য হয়েই পাকিস্তানের সংহতির পক্ষে ছিলেন তাদের উপর পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের অনুচর এদেশীয় কিছু দুষ্টলোকের দ্বারা সংঘঠিত অপরাধ চাপিয়ে দিয়ে তাদেরকে হত্যার প্রচেষ্টা চালাবে এটি আওয়ামী রাজনীতির জন্য কি আর এমন মহাভারত অশুদ্ধ হল?