১০৮ ঘন্টার হরতাল ও কিছু কথা

১০৮ ঘন্টার হরতাল ও কিছু কথা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে হরতাল অতি পরিচিত একটি প্রতিবাদ কর্মসূচির নাম। অতি সাধারণ বিষয়ে বা তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ইস্যু ছাড়াই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট কর্তৃক হরতাল পালন করার নজির এদেশে রয়েছে। যদিও সাধারণভাবে এদেশের মানুষ হরতাল পছন্দ করে না। কারণ হরতালের নাম শুনলেই এর একটি নেগেটিভ চিত্র মানুষের সামনে ভেসে আসে। আর তা হলো হরতাল মানেই আগের দিন থেকে শুরু করে হরতাল শেষ হওয়া পর্যন্ত গাড়িতে আগুন, পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ হত্যা, গাড়ি ভাংচুরসহ অনেকটা গায়ের জোরে জনসাধারণকে হরতাল মানতে বাধ্য করা। এটি হচ্ছে আমাদের দেশের হরতালের অতি সামান্য একটি চিত্র। ফলে হরতাল ডাকলেই মানুষ আতংকগ্রস্থ হন, কারণ কখন কার উপর হামলা হয় এই আশংকায়। কিন্তু হরতালের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমধর্মী নজীর স্থাপন করলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

হরতাল সম্পর্কে উপরে বর্ণিত চিত্রের কোন কিছু করা ছাড়াই জনগণের স্বত:স্ফূর্ত সমর্থন ও জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক তৎপরতার মাধ্যমে হরতাল বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো। আমার এ বক্তব্য বাংলাদেশের সকল প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় পরিবেশিত সংবাদ দ্বারা সত্যায়িত। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গত ৩১ শে অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকাল ৬ টা থেকে (মাঝখানে শুক্র, শনি ও মঙ্গলবার ছুটির দিনগুলো) বাদ দিয়ে ৭ নভেম্বর ভোর ৬ টা পর্যন্ত তিন দফায় মোট ১২০ ঘন্টার লাগাতার হরতাল আহবান করে। পরে পবিত্র আশুরার জন্য সোমবার সন্ধ্যা ৬ টা থেকে মঙ্গলবার ভোর ৬ টা পর্যন্ত ১২ ঘন্টার হরতাল কমিয়ে এনে সর্বমোট ১০৮ ঘন্টার এক ব্যতিক্রমধর্মী হরতাল কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এককভাবে টানা এত দীর্ঘ সময় হরতালের ঘটনা বিরল। অনেকটা বাধ্য হয়েই জামায়াত এ হরতাল আহবান করে। গত ২৯ শে অক্টোবর সকাল ১১ টার পর থেকে গণমাধ্যমে খবর আসতে থাকে ৩০ শে অক্টোবর বুধবার আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর কথিত মানবতাবিরোধী মামলার রায় প্রদান করা হবে। খবরটি শুনার সাথে সাথে কিছুটা স্তম্ভিত হলাম। কিন্তু বিস্মিত হলাম না। কারণ এই সরকারের পক্ষে এ ধরণের অমানবিক ঘটনার জন্ম দেয়া মোটেই কোন বিস্ময়ের বিষয় নয়। কারণ মানবিকতা, সহমর্মিতা, মানবতাবোধ সম্মানীয় মানুষকে সম্মান প্রদান ইত্যাদি রাজনৈতিক শিষ্টাচার এ সরকারের কর্তা ব্যক্তিদের কাছ থেকে বহু আগে উধাও হয়ে গেছে। মানবাধিকার লংঘন ও স্বৈরতান্ত্রিক আচরণে এ সরকার এখন বিশ্বচ্যাম্পিয়নশীপ অর্জন করেছে।

যখন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর লক্ষ-লক্ষ নেতা-কর্মী, সাধারণ বিবেকবান মানুষসহ বিশ্বের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মানুষ তাদের প্রিয় নেতা, বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের অভিবাবক, ভাষা সৈনিক, ডাকসু’র সাবেক নির্বাচিত জি.এস ও বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ মজলুম জননেতা মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযমকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান । সবাই যখন অশ্রুসজল, নফল ইবাদত, দোয়া -দরুদ সহ নানা স্মৃতিচারণে ব্যস্ত ঠিক সেই মুহুর্তে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমীর, সাবেক সফল মন্ত্রী, বিশ্বের প্রভাবশালী ইসলামিক স্কলার ও ব্যক্তিত্ব, জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ, প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন, নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী, আজন্ম ভদ্র, শান্ত-শিষ্ঠ একজন আল্লাহর মুহসিন বান্দা জননেতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেয়ার নীল নকশায় নতুন করে মেতে ওঠে সরকার।

শুধু এখানেই শেষ নয়, মিথ্যা মামলায় সাজানো স্বাক্ষীর মাধ্যমে তাঁকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করে ফাঁসির দন্ডে দন্ডিত করা হয়। সরকারের এহেন হীন চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামী তাৎক্ষণিক শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সহ পরের দিন ৩১ শে অক্টোবর সকাল ৬ টা থেকে ০১ লা নভেম্বর সকাল ৬ টা পর্যন্ত প্রথম দফায় ২৪ ঘন্টা এবং শুক্র ও শনিবার বিরতি দিয়ে রবিবার সকাল ৬ টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬ টা পর্যন্ত ৭২ ঘন্টার সর্বাত্নক হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা দেয়। জামায়াত নেতা-কর্মীগণ দল কর্তৃক ঘোষিত কর্মসূচি নিয়ে যখন ব্যস্ত তখনই ৩১ শে অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকাল ১০ টার পর জানা গেল ইসলামী আন্দোলনের আরেকজন সিপাহসালার, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা কেন্দ্রিয় সভাপতি মীর কাসেম আলীর কথিত মানবতাবিরোধী মামলার রায় ৩ নভেম্বর প্রদানের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে সরকার কর্তৃক মিথ্যা ও সাজানো মামলায় মীর কাসেম সাহেবকেও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করা হলো।

প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামী একদিনের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও ২৪ ঘন্টার হরতাল আহবান করে। আমীরে জামায়াতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে চলতে থাকা কর্মসূচির মধ্যেই মিডিয়ার মাধ্যমে আমরাসহ দেশবাসী অবগত হলাম ৪ নভেম্বর সোমবার জামায়াতের সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সম্পাদক যিনি এফসিও অতিথি হিসেবে যুক্তরাজ্য সফর করেছেন, তাঁকে ট্রাইবুনাল কর্তৃক প্রদান করা প্রাণদন্ডের বিরুদ্ধে আপিলের রায় প্রদান করা হবে। একদিকে অভিবাবক হারিয়ে বাকরুদ্ধ আন্দোলনের জনশক্তি, অপর দিকে মানবতাবিরোধী আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার কর্তৃক আমীরে জামায়াতসহ তিনজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও ইসলামী আন্দোলনের তিন প্রাণপুরুষকে পর পর হত্যার ষড়যন্ত্র, ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে তাদেরকে দূর্বল করার অপচেষ্টা অন্যদিকে অব্যাহত উস্কানিমূলক আচরণের মাধ্যমে উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়ে ফায়দা হাসিলের ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালানো হয়।

কর্মী ও জনগণের প্রিয় নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক অবিচার আর মিথ্যাচার চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের কারণে বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীদের শান্ত রাখাটা ছিল অনেক বড় ধৈর্যের পরীক্ষা। মানবতাবিরোধী সরকার ও তার উপদেষ্টারা মনে করেছিল প্রিয় নেতাকে হারিয়ে আমরা দিশেহারা হয়ে গিয়েছি সুতরাং এই অবস্থায় তারা তাদের চক্রান্ত সহজেই বাস্তবায়ন করতে পারবে। তারা উপুর্যুপরি অপতৎপরতা চালিয়ে আমাদের নেতা-কর্মীসহ সাধারণ জনতাকে উত্তেজিত করতে চেয়েছিল। তারা বেশি চালাকি করতে গিয়ে নিজেরা গঁলায় দঁড়ি দিয়েছে। এ কাজটি করার জন্য তারা কোমলমতি ছাত্রদের জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার সময়টাকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছে। তারা ভেবেছিল এ সময় হয়তো জামায়াত হরতাল দেবেনা আর দিলে জনগণকে জামায়াতের বিরুদ্ধে উস্কানো সম্ভব হবে। বিধি বাম।

সরকারের এ উদ্দেশ্য মাঠে মারা গিয়েছে। জনগণ জামায়াতের বিরুদ্ধে বিরুপ ভাবাপন্ন তো হয়ই-নি বরং স্বত:স্ফ’র্ত হরতাল মেনে নিয়ে জনগণ জামায়াতের প্রতি তাদের সহমর্মিতা ও সমর্থন ব্যক্ত করেছে। আর ধিক্কার জানিয়েছে সরকারের দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত অন্যায়, অযৌক্তিক ও অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে। এ হরতাল পালনের মাধ্যমে জনগণ তাদের অবস্থান পরিষ্কার ভাবে ব্যক্ত করেছে। জনগণ সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে তথাকথিত মানবতাবিরোধী বিচারের নামে দেশপ্রেমিক জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও প্রখ্যাত আলেমে দ্বীনদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে বিচারের নামে যে প্রহসন চলছে তা তারা সমর্থন করেনা। এটিকে জনরায় হিসেবে গ্রহণ করে অবিলম্বে সরকার এ সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম বন্ধ করবেন দেশবাসী তা প্রত্যাশা করেন।

আমি লিখছিলাম ১০৮ ঘন্টার হরতাল প্রসঙ্গে। বাংলাদেশে সেই স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে ১৫ দলীয় জোট, ৭ দলীয় জোট ও জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক কখনও কখনও যৌথ কখনও কখনও আলাদাভাবে কর্মসূচি পালন থেকে শুরু করে কেয়ারটেকারের দাবিতে আওয়ামীলীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। (অবশ্য জামায়াত তখন স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধী ছিল না, যেহেতু তারা আওয়ামীলীগের সাথে আন্দোলন করেছে) এরপর বিএনপি, জামায়াত ও চারদলীয় জোট কর্তৃক শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং অতি সম্প্রতি ২০ দলীয় জোট কর্তৃক স্বৈরাচারিনী শেখ হাসিনার অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আমার দেখার সুযোগ হয়েছে। শুধু জামায়াতে ইসলামীর ডাকে পালিত হরতাল আমার মনে হয় রেকর্ড করেছে।

মিডিয়ার ভাষ্যমতে জামায়াতে ইসলামী হরতাল ডেকে তাদের ভাষায় কোন সহিংসতা তো দূরে থাক ঝটিকা মিছিল ছাড়া তেমন কোন পিকেটিং বা এ অন্যকোন তৎপরতা চালায়নি। এ দ্বারা প্রমাণিত হয় জামায়াতের হরতালে বল প্রয়োগ ছাড়াই স্বত:স্ফুর্তভাবে জনগণ সমর্থন প্রদান করেছেন। যদিও মিডিয়ার একটি অংশ সরকারী দলের লোকদের মতো জামায়াতের হরতাল ঢিলেঢালাভাবে হচ্ছে, জীবনযাত্রা স্বাভাবিক, গণপরিবহন ও জনসাধারণ রাস্তায় নেমে এসেছে ইত্যাদি প্রপাগান্ডা চালিয়ে হরতালকে দূর্বল করতে কোন অপচেষ্টা বাকী রাখেনি। তারপরও তাদের মিথ্যা প্রপাগান্ডায় জনগণ সাড়া দেয়নি। মিডিয়ার এ অংশটি অতি চালাকীর আশ্রয় নিয়ে সরকারের দালালী করতে গিয়ে শুধু নিজেদের প্রাইভেট চ্যানেলটিকেই নয় বরং পুরো প্রাইভেট মিডিয়ার বিশ্বাস যোগ্যতাকেই জনগণের সামনে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। আল্টিমেটলি এর মধ্য দিয়ে সরকারী টেলিভিশন বিটিভি’র প্রতি মানুষের আস্থা হীনতার প্রেক্ষাপটে বেসরকারী টেলিভিশনের খবর ও অন্যান্য প্রতিবেদনের ব্যাপারে জনগণের উৎসাহ উদ্দিপনা ও আস্থা তারা ধ্বংস করে দিচ্ছেন।

কোন কোন টিভি চ্যানেল হলুদ সাংবাদিকতার আশ্রয় নিয়ে নির্লজ্জভাবে শুধু সরকারের পারপাসই সার্ভ করছেনা বরং তারা মিথ্যার বেসাতি চালাচ্ছে। তারা জাতিকে দ্বিধা বিভক্ত, হিংসা-বিদ্বেষ উসকিয়ে দেয়াসহ বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চিন্তা-চেতনার প্রতিনিধিত্বকারী, গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক ধারার অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তার দেশপ্রেমিক জাতীয় নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে অব্যাহত বিষোদাগার চালিয়ে যাচ্ছে। মিডিয়ার এ অংশটি জনগণকে বোকা ভাবে আর নিজেদেরকে অতিবুদ্ধিমান মনে করে। কিন্তু প্রকারান্তরে নিজেরাই বোকার স্বর্গে বাস করছে এবং নিজেদেরকে জন সেন্টিমেন্টের বিরুদ্ধে একটি ঘৃণার জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে এটা বুঝতে পারলে তাদেরই ভালো হতো।

মিডিয়াকে বলা হয় সমাজের দর্পন বা আয়না। আয়নার সামনে দাঁড়ালে আয়না কোন বেশ কম ছাড়াই প্রকৃত অবস্থান শো করে। তেমনি মিডিয়াকে দলবাজি ছাড়াই সমাজের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হবে। দলবাজি করার জন্য মিডিয়ার পরিচয় প্রত্যাখ্যান করে সংশ্লিষ্ট দল বা রাজনীতির সাথে মিশে গেলেই তারা ভালো করবেন। ৪ নভেম্বর ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের একটা টকশো দেখলাম। বিষয় ছিলো ‘প্রতিফলন না প্রতিসরণ’। সেখানে এক নারী সাংবাদিক তার মত ব্যক্ত করে বললেন, জামায়াতে ইসলামীর ‘ওয়েবসাইট’ থেকে নিজউ পরিবেশন করে সংবাদ কর্মীরা নাকি ঠিক কাজ করছেনা। সেখানে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য চ্যানেলের অন্তত: বিশিষ্ট আরো পাঁচজন সাংবাদিক সর্বজনাব মোজাম্মেল বাবু, মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, আহমেদ জুবায়ের, রেজওয়ানুল হক ও মোস্তফা ফিরোজ দিপু উনারা অবশ্য এটার প্রতিবাদ করে বলেন, জামায়াত যেহেতু সাংবিধানিকভাবে একটি বৈধ রাজনৈতিক দল সুতরাং তাঁর ‘ওয়েবসাইট’ থেকে নিজউ প্রচারে কোন অসুবিধা থাকার কথা নয়। সম্মানিত বিশিষ্ট এ-পাঁচ সাংবাদিককে ধন্যবাদ সত্য ভাষণের জন্য। আমি মনে করি মিডিয়ার কোন পক্ষপাতিত্ব করা উচিত নয়। এতে ম্ক্তু গণমাধ্যমের গতি ধারা ব্যহত হবে। বাস্তবে এর দ্বারা ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী শক্তিই লাভবান হবে। ক্ষতিগ্রস্থ হবে মুক্তধারা, দেশ, দেশের জনগণ ও দেশের ভবিষ্যত কর্ণধারেরা।

মিডিয়ার পরস্পর বিরোধী বক্তব্য মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতার নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জাতিকে হতাশ করে। যেমন জামায়াতের এই ১০৮ ঘন্টা হরতালের খবর প্রচার করতে গিয়ে ইলেকট্রনিক সংবাদ মাধ্যমের একটা অংশ যে চালাকির আশ্রয় নিয়ে সরকারের পক্ষ অবলম্বন ও জামায়াতের বিরোধীতায় অবতীর্ণ হয়েছে তা খুবই নগ্নভাবে ধরা পড়েছে। চ্যানেলগুলোর নিউজ হেডলাইন ও বিস্তারিত নিউজ লাইভ কাষ্টসহ যেভাবে পরিবেশন করা হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত একটা চিত্র আমি পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে চাই।

একটা হেডলাইন ছিল এভাবে: জামায়াতের হরতাল ঢিলেঢালাভাবে পালিত হচ্ছে, মাঠে নেই জামায়াত শিবিরের নেতা-কর্মীরা। অথচ ফুটেজে দেখানো হচ্ছে জামায়াত শিবিরের শান্তিপূর্ণ মিছিল, আর সে মিছিলে আক্রমণ করছে পুলিশ এমন দৃশ্য। মাঠে না থাকলে মিছিলের ছবি কোথা থেকে আসল আর পুলিশই বা কার ওপর আক্রমণ চালালো? জনমনে এমন প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক।

আরেকটা হেডলাইন: জামায়াতের ডাকে ৪৮ ঘন্টার হরতাল ঢিলেঢালাভাবে চলছে, রাজধানীতে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক। সেখানে লাইভ ফুটেজে দেখানো হচ্ছে রাস্তা-ঘাট ফাঁকা, কোন পরিবহন নেই।

আরেকটা হেডলাইল হলো: জামায়াতের ডাকা দ্বিতীয় দফা হরতাল ঢিলেঢালাভাবে পালিত হচ্ছে, গণপরিবহন সহ ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রাইভেট গাড়ী রাস্তায় ব্যাপক চলছে। আবার একই সাথে বলা হচ্ছে, পরিবহনের অভাবে সাধারণ নাগরিকদের ভোগান্তি, মানুষ পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছে । একদিকে ব্যপক গণপরিবহন চলছে, অন্যদিকে গন্তব্যে পৌছতে পরিবহনের জন্য রাস্তায় মানুষের জটলা ও ভোগান্তির দৃশ্য পরিবেশন। তাহলে এরকম পরস্পরবিরোধী সংবাদ পরিবেশনা থেকে মানুষ কি বুঝবে?

আরেকটি হেডলাইন: হরতালে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক অন্যদিকে ফুটেজে কাঁচামালের বাজার দেখিয়ে বলা হচ্ছে, পরিবহনের অভাবে মাল আনা নেয়া যাচ্ছে না বলে জিনিস পত্রের দাম বেশি, ক্রেতার উপস্থিতি কম।

অন্য আরেকটি হেডলাইন হলো: জামায়াতের হরতালে জনগণের সাড়া মেলেনি এবং জীবন যাত্রার ওপর এর কোন প্রভাব পড়েনি। আবার বলা হচ্ছে প্রতিদিন গড়ে হরতালে হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। বিদেশী অর্ডার বাতিল হচ্ছে ইত্যাদি।

সুতরাং মিডিয়ার একটি অতি উৎসাহি দলকানা অংশ যতই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করুক না কেন তাদের পরিবেশিত এই সব সংবাদের ওপর যে দেশবাসীর পুরোপুরি আস্থা নেই এটি অত্যন্ত পরিষ্কার। ফলে তারা যা বলবে জনগণ তাতেই বিশ্বাস করে বা করবে তার কোন ভিত্তি নেই। জনগণ এখন অনেক সচেতন। মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দিয়ে জনগণকে বোকা বানানোর দিন শেষ। কথা আছে মিথ্যা কথা কখনো জোড়া লাগেনা। সত্যকে ঢাকতে গিয়ে অসংখ্য মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। সেজন্যই হয়তো গোয়েবলস বলেছিলেন, একটা মিথ্যাকথা একশ বার বললে তা সত্য বলে মানুষ বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়। মিডিয়ার এ অংশ গোয়েবলসকেও হার মানিয়েছে। গোয়েবলস বেঁচে থাকলে হাসতেন না কাঁদতেন তা জানিনা। কারণ তিনি যেটা ১০০বারের কথা বলেছিলেন তাঁর অনুসারীরা এটাকে ১০০০বার বলতেও দ্বিধা করছেনা। তবুও সত্যকে চাপা দিতে হবে।

একটি টকশোতে কথা বলতে গিয়ে তাদেরই একজনের মুখ দিয়ে তার স্টেশন পলিসি ও তাদের ষড়যন্ত্রের কিছু দিক বেরিয়ে এসেছে। তারা জামায়াতের যেকোন ভাল কাজকে অর্থাৎ সত্যকে ঢাকবার জন্য কিভাবে ষড়যন্ত্রের কুটিল জাল বিস্তার করেন তার কিঞ্চিৎ বর্ণনা যারা ঐ টকশোটি দেখেছেন তারা হয়তা উপলব্দি করতে পেরেছেন। অধ্যাপক গোলাম আযমের জানাযায় এতো লোক কোথায় থেকে আসল! এটা জনগণকে ভুলভাবে বুঝানোর জন্য তিনি কি করেছেন তার একটা ফিরিস্তি দিলেন। তিনি বললেন, আমি ফুটেজে দেখালাম ইসলামী ব্যাংক ও ইবনে সিনার কর্মকর্তারা তাদের অফিসের কাজ গুলো গুছিয়ে অফিস ছেড়ে জানাজায় অংশ নিয়েছে। আর এভাবেই গোলাম আযমের জানাযা বিরাট বড় হয়েছে। মিথ্যার ভিত্তি যে মাকড়সার জালের চাইতেও দূর্বল এটা হলো তার দৃষ্টান্ত। জানাযায় লোক হয়েছে লক্ষ-লক্ষ আর ইবনে সিনা ও ইসলামী ব্যাংকে চাকুরী করে লোক সংখ্যা কত? সম্মানিত পাঠক আপনারা আমাদের দেশের মিডিয়ার এ অংশটি সম্পর্কে সম্মক অবহিত। তারপরও আমি তার কিঞ্চিৎ তুলে ধরলাম। এরাই জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করাকে ঝটিকা বা ঢিলেঢালা বলে মিডিয়ায় কভারেজ দিতে চায়না। আর পুলিশের হামলা, গুলি ও বাড়াবাড়ির মোকাবেলায় আমাদের দু’একজন কর্মী আতœরক্ষার্থে ঢিল মারলে, এটিকে জামায়াত-শিবিরের পক্ষ থেকে সহিংস আচরণ করা হয়েছে বলে সংবাদ পরিবেশন করে। তারা তিলকে তাল বানিয়ে জামায়াতকে সন্ত্রাসী, জঙ্গী সংগঠন হিসেবে তুলে ধরতে চায়।

সুতরাং জামায়াতের ডাকে ১০৮ ঘন্টার হরতাল সফল হয়েছে এ দেশের জনগণের সমর্থন ও স্বত:স্ফুর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এবং মিডিয়ার এ অংশটির মিথ্যাচার সত্ত্বেও জনগণ দেখেছে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা হরতাল ডেকে মাঠ থেকে উধাও হয়ে যায়নি। বরং তারা শক্তভাবে মাঠে ছিল। নিয়মতান্ত্রিকভাবে মিছিল, পিকেটিং সবই তাঁরা করেছে। তবে তারা হরতাল বাস্তবায়নের জন্য গাড়িতে আগুন ও পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করেনি। জ্বালাও পোড়াও ও ভাংচুরে যায়নি। এটি জামায়াত শিবিরের বৈশিষ্ট্যও নয়। বরং জামায়াত-শিবিরের দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য হল-শৃঙ্খলা, নিয়মতান্ত্রিকভাবে আইন ও সংবিধানের অনুসরণ। যারা জামায়াত ও শিবিরকে সহিংস ও জঙ্গি বলেন, তাদেরকে জিজ্ঞেস করতে চাই তাদের এ বক্তব্যের ভিত্তি কি? তারা কি আজ পর্যন্ত জামায়াত ও শিবিরের ভাইদের কাছে একটি খেলনা পিস্তলও দেখাতে পেরেছেন? অবশ্যই পারেননি। আর পারবেনও না ইনশাআল্লাহ।

লেখকঃ কেন্দ্রিয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।